কষ্টের জীবন কাহিনী ।। পার্ট -০১

আমি একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।  বাড়িতে বাবা আর দাদা থাকেন। ছোট বেলায় মা মারা গিয়েছেন। বাবা যেহেতু সরকারি চাকরি করতেন তাই বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকতেন তাই দাদা আমার খুব কাছের ছিল। দাদা যেহেতু ছোট থেকেই খুব লাজুক আর সাদা-সিধে ছিল তাই মা দাদা কে খুব ভালোবাসতেন। মা মারা যাওয়ার পর দাদা খুব একা হয়ে যায়। নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্দি করে ফেলে। কথা বলা একপ্রকার বন্ধ করে দেয়। আর এর ফলে ও বাইরের জগত থেকে বিছিন্ন হয়ে পরে। আমি কিছুতেই দাদাকে বাইরে নিয়ে জেতে পারতাম না। দাদা এতো সাদাসিধে ছিল যে সবাই ওর দুর্বলতার সুযোগ নিত, কখনো যদি বা বাইরে বেরত সবাই ওকে নিয়ে হাসি মজা করত। আর ও একদম এইসব পছন্দ করত না যার ফলে ওর কেও বন্ধু হতে চাইত না। দাদা কে আমি কতবার কতবার বুঝিয়েছি, কেও গালাগাল করলে তুইও গালাগাল করিস ,কেও তোকে মারলে তুইও মারার চেষ্টা করবি, এই দুনিয়াতে চুপ-চাপ থাকলে মানুষ আরও বেশি সুযোগ নেবে। কিন্তু দাদা এই সব করতে পারে না। তাই সবাই ওকে এমন খ্যাপাতে লাগলো যে ওর একেবারেই বাইরে বেরনো বন্ধ হয়ে গেল। এরপর বাবা একদিন চাকরি থেকে অবসর নিলো আর এই সময় বাবা দাদার খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠল।

  দাদার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভাল ছিল কিন্তু বাবাকে এতো কাছে পেয়ে দাদা কিছুটা মনোবল ফিরে পেল। ও আবার আগের মতো বাইরে ঘুরতে লাগল তবে এবার বাবার হাত ধরে। বাবাকে খেতে দেওয়া, ওষুধ দেওয়া, স্নানের জল এনে দেওয়া সব দাদা করত। আমাকেও বাড়িতে সেরকম কোন কাজ করতে দিত না। দাদার সঙ্গে বাবার বন্ধুত্ব সবার মুখে মুখে ঘুরতে থাকে। এরপর দাদা আমার সঙ্গেও বিভিন্ন জাইগায় ঘুরতে লাগলো। দাদার খুব আনন্দে দিন কাটতে লাগলো।
এই ভাবে বছরের পর বছর কেটে যায় আর বাবার বয়স বাড়তে থাকে। এর মধ্যে বাবাকে বেশ কয়েক বার হসপিটালে ভর্তি করতে হয়। বাইরের জগত না জানা সত্ত্বেও  প্রতিবার দাদা নিজে বাবাকে হসপিটালে ভর্তি করতে সক্ষম হয়। কাজের সূত্রে আমি বাইরে থাকতাম বলে আমার সঙ্গে সঙ্গে আসা হতো না। অনেক সময় এমন হয়েছে যে বাবার যে শরীর খারাপ সেটাও আমাকে জানাত না। কারন দাদা ভাবতো বাবার খবর শুনে আমি হয়তো বেশি টেনশন করবো। আর বাবার শরীর সুস্থ হওয়ার পর ও আমাকে সব জানাত। এখনো এই ভাবেই চলছে। আসলে দাদার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুব গভীর। দাদার সব থেকে বড় সমস্যা ও কিছু ইনকাম করতো না। আসলে বাবাই ওকে কিছু করতে দেয় নি। বাবা মাঝে মধ্যে খুব অসুস্থ হয়ে পরত।  এই সময় দাদা না থাকলে বাবা খুব সমস্যায় পরবে এই ভেবে বাবা দাদা কে কোন দিন কাজে যুক্ত হতে দেয় নি। দাদার সব থেকে বেশি চিন্তা ছিল বাবার কিছু হয়ে গেলে কি ভাবে চলবে? আর আমাদের চিন্তা ছিল বাবার কিছু হয়ে গেলে দাদাকে সামলাবো কিভাবে? দাদা যে বাবার প্রান।।

     
দাদা-বাবা দুজন দুজনকে ছাড়া থাকতে পারে না। তাই দাদা যদি বাইরে যায় বাবাকে সঙ্গে নিয়ে যায়। আর যদি দাদা একা যায় তাহলে খুব বেশি হলে ১০ মিনিট বাইরে থাকে। বাবাকে দেখাশুনার যাতে কোন অসুবিধা না হয় তাই দাদা বিয়ে করে নি কারন দাদা মনে করত বিয়ে করার পর যদি বৌ, দাদাকে বাবার থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে তাই কোন রিস্ক নেয় নি। দাদাকে কতো বুঝিয়েছি, সব মেয়ে সমান হয় না কিন্তু দাদা ওইসব বুঝতে চাইত না। মাঝে মাঝে ভাবি এমন দাদা কতো জনের কপালে জোটে?

এই সমাজে যেখানে অনেকেই মা-বাবার বয়স হলে তাদের বোঝা মনে করে সেখানে দাদা একেবারে ভিন্ন।
 



মন্তব্যসমূহ